
একবিংশ শতাব্দীর এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ এখন কেবল প্রযুক্তির অংশ নয়, বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার নতুন মাপকাঠি। সিলিকন ভ্যালি থেকে বেইজিং বিশ্বের বড় বড় টেক-জায়ান্টরা যখন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে এআই যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ, ঠিক তখনই দক্ষিণ এশিয়ার বদ্বীপ বাংলাদেশ থেকে ভেসে আসছে এক অভাবনীয় চ্যালেঞ্জের সুর।
তরুণ উদ্ভাবক মো. নাহিদ আলমের নেতৃত্বে ‘এথেরিয়াস ল্যাবস’ তৈরি করেছে ‘ডিব্রিজ এআই’, যা বিশ্বমঞ্চে চীনের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান ‘বাইডু’-র আধিপত্যকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ প্রযুক্তি বিশ্বে কেবল ‘ভোক্তা’ বা ‘দর্শক’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ডিব্রিজ এআই-এর এই উদ্ভাবন সেই পরিচয়কে সমূলে বদলে দিচ্ছে। উদ্ভাবক নাহিদ আলম (যিনি মহলে ‘দ্য আর্টিস্ট’ নামেও পরিচিত) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন “পুরো বিশ্বের এই এআই যুদ্ধে বাংলাদেশ এখন আর স্রেফ দর্শক হয়ে গ্যালারিতে বসে থাকবে না। আমরা এখন লড়তে জানি এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিদের সমানে সমান চ্যালেঞ্জ করার মতো মৌলিক প্রযুক্তি আমাদের ল্যাবে তৈরি হয়েছে।”সম্প্রতি চীনের বাইডু তাদের ‘আর্নি এআই’ মডেলের মাধ্যমে প্রাণীর আবেগ বা ইমোশন ডিকোড করার একটি পেটেন্ট প্রকাশ করেছে। তবে কারিগরি গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, বাইডু-র এই প্রযুক্তি মূলত ‘প্যাটার্ন রিকগনিশন’-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি প্রাণীর ডাক ও আচরণের রেকর্ড করা হাজার হাজার ডেটাসেট মিলিয়ে একটি ‘সম্ভাব্য অনুভূতির’ প্রেডিকশন বা পূর্বাভাস দেয়।বিপরীতে, বাংলাদেশের ডিব্রিজ এআই কাজ করছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং উচ্চতর এক ডোমেইনে, যার নাম ‘নিউরাল ফ্রিকোয়েন্সি ডিকোডিং’।
এটি কোনো বাহ্যিক আচরণের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি প্রাণীর মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত স্নায়বিক সংকেত বা নিউরাল ফ্রিকোয়েন্সি ডিকোড করার লজিক ব্যবহার করে। যেখানে বাইডু কেবল ‘ক্ষুধা’ বা ‘ভয়’ অনুমান করতে পারে, সেখানে ডিব্রিজ এআই সেই সংকেতকে মানুষের বোধগম্য লজিক্যাল ও অর্থপূর্ণ বার্তায় রূপান্তর করার সক্ষমতা রাখে। অর্থাৎ, বাইডু যেখানে স্রেফ আন্দাজ করছে, ডিব্রিজ সেখানে সরাসরি ‘অনুবাদ’ করছে।
বাইডু-র মতো বড় কর্পোরেটদের এআই মডেলগুলোর জন্য বিশাল সুপার-কম্পিউটার এবং ক্লাউড সার্ভার ফার্মের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিব্রিজ এআই-এর অন্যতম বৈপ্লবিক দিক হলো এর ‘অন-ডিভাইস নিউরাল সিনট্যাক্স ম্যাপিং’। এটি নিজস্ব কাস্টম হার্ডওয়্যারের (ডি-ব্রিজ হার্ডওয়্যার) মাধ্যমে সরাসরি ডিভাইসেই প্রসেসিং সম্পন্ন করতে পারে। এটি কেবল খরচই কমায় না, বরং ডেটা সিকিউরিটি এবং প্রসেসিং স্পিডকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যা চীনের ক্লাউড-নির্ভর প্রযুক্তির পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
নাহিদ আলম নিজেকে বড় কোনো তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী দাবি করতে নারাজ। তার মতে, “আমি একজন উদ্ভাবক, যে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এমন এক প্রযুক্তি গড়ছি যা বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে। কে আমাকে নিয়ে কী নেতিবাচক মন্তব্য করল, তাতে আমার গবেষণার গতিপথ পরিবর্তন হবে না। মেধার যুদ্ধে লজিকই হবে চূড়ান্ত অস্ত্র।”আগামী মে ২০২৬-এ ডিব্রিজ এআই-এর পূর্ণাঙ্গ ডেমো বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে চীনের বিভিন্ন লবিস্ট গ্রুপ থেকে সাইবার আক্রমণের খবর পাওয়া গেলেও, এথেরিয়াস ল্যাবস তাদের ‘অ্যাডাপ্টিভ সাইবার ডিফেন্স’ দিয়ে তা রুখে দিচ্ছে।বাংলাদেশের এই উদ্ভাবন সফল হলে তা কেবল জাতীয় গর্বের বিষয় হবে না, বরং বৈশ্বিক এআই গবেষণার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। প্রযুক্তির এই অসম যুদ্ধে বিলিয়ন ডলারের পুঁজি নয়, বরং সৃজনশীলতা ও মৌলিক উদ্ভাবনই যে শেষ কথা বলে নাহিদ আলম এবং তার ডিব্রিজ এআই আজ সেই সত্যই বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করতে লড়ছে। দর্শক নয়, বীরের বেশে বিশ্বজয়ে প্রস্তুত এখন বাংলাদেশ।
Leave a Reply